সাদ্দাম-গাদ্দাফির পর মার্কিন আগ্রাসনের শিকার খামেনি

সাদ্দাম-গাদ্দাফির পর মার্কিন আগ্রাসনের শিকার খামেনি

একুশে সিলেট ডেস্ক

আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও সংঘাতের ইতিহাসে গত কয়েক দশকে এমন কিছু মুহূর্ত এসেছে যা বৈশ্বিক সমীকরণ বদলে দিয়েছে। বিশেষ করে ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে নিহত হওয়া ইসলামি দেশগুলোর শীর্ষ নেতাদের মৃত্যুর ঘটনাগুলো ছিল নাটকীয় আর প্রচণ্ড উত্তেজনায় ঠাসা।

সর্বশেষ রোববার ভোরে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন নিশ্চিত করেছে, দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এক বিধ্বংসী হামলায় মারা গেছেন।

ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের এই নজিরবিহীন যৌথ বিমান হামলায় খামেনির বাসভবনসহ ইরানের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা ও ব্যালিস্টিক মিসাইল সাইটগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। এই অভিযানে ইরানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী আমির নাসিরজাদেহ এবং প্রভাবশালী আইআরজিসি কমান্ডার মোহাম্মদ পাকপুরও নিহত হয়েছেন। এটি ইরানের দীর্ঘ রাজনীতির ইতিহাসে তৈরি করেছে সবচেয়ে বড় নেতৃত্ব শূন্যতা।

বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শক্তিশালী নেতা ইরাকের সাবেক প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের মৃত্যু ছিল ভিন্নধর্মী। ২০০৩ সালে মার্কিন আগ্রাসনের পর তিকরিতের একটি গোপন গর্ত থেকে তাঁকে আটক করা হয়। ২০০৬ সালের ৩০ ডিসেম্বর ঈদুল আজহার দিনে ভোরবেলায় বাগদাদের একটি সামরিক ঘাঁটিতে তাঁর ফাঁসি কার্যকর করা হয়। মার্কিন সমর্থিত বিশেষ ট্রাইব্যুনালে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের দায়ে তাঁকে এই দণ্ড দেওয়া হয়।

লিবিয়ার দীর্ঘ সময়ের শাসক মুয়াম্মার গাদ্দাফি ২০১১ সালে ন্যাটোর বিমান হামলার নিহত হন। তাঁর গাড়িবহর যখন সির্ত শহর থেকে পালাচ্ছিল, তখন মার্কিন ড্রোন এবং ফরাসি যুদ্ধবিমান থেকে সেটিকে থামিয়ে দেওয়া হয়। গাদ্দাফি একটি ড্রোনে আশ্রয় নিলেও বিদ্রোহী বাহিনী তাঁকে খুঁজে পায় এবং গণপিটুনির পর পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জে গুলি করে তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত করে।

সবচেয়ে আলোচিত সামরিক হত্যাকাণ্ডগুলোর মধ্যে ছিল ২০২০ সালের জানুয়ারিতে ইরানি জেনারেল কাসেম সোলেইমানির মৃত্যু। বাগদাদ বিমানবন্দরের কাছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি নির্দেশে একটি মার্কিন এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন থেকে হেলফায়ার মিসাইল ছুড়ে তাঁর গাড়ি উড়িয়ে দেওয়া হয়।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে লেবাননের বৈরুতে এক ভয়ঙ্কর হামলা চালায় ইসরায়েল। হিজবুল্লাহর দীর্ঘকালীন প্রধান হাসান নাসরুল্লাহ যখন মাটির ৬০ ফুট নিচে একটি সুরক্ষিত বাঙ্কারে সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের নিয়ে বৈঠক করছিলেন, তখন ইসরায়েলি বিমান বাহিনী একের পর এক ‘বাঙ্কার বাস্টার’ বোমা বর্ষণ করে। প্রায় ৮০টি ভারী বোমা ব্যবহারের ফলে পুরো ভূগর্ভস্থ সদর দপ্তরটি ধ্বংস হয়ে যায় এবং নাসরুল্লাহর মৃত্যু নিশ্চিত হয়। ইসরায়েল এই অভিযানের নাম দিয়েছিল ‘অপারেশন নিউ অর্ডার’।

একই বছরের জুলাইয়ে ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী হামাসের রাজনৈতিক প্রধান ইসমাইল হানিয়াহ ইরানের তেহরানে এক রহস্যজনক ও সুপরিকল্পিত হামলায় নিহত হন। ইরানের নতুন প্রেসিডেন্টের শপথ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে গিয়ে তিনি একটি রাষ্ট্রীয় গেস্ট হাউসে অবস্থান করছিলেন। রাত ২টার দিকে সেখানে একটি ভয়াবহ বিস্ফোরণ ঘটে। গোয়েন্দা রিপোর্ট অনুযায়ী, কয়েক মাস আগেই সেই ঘরে অত্যন্ত শক্তিশালী বিস্ফোরক রিমোট কন্ট্রোল ডিভাইস লুকিয়ে রাখা হয়েছিল, যা হানিয়াহ ঘরে ঢোকার পর দূর থেকে সক্রিয় করা হয়।

ফিলিস্তিনি প্রতিরোধের আরেক মুখ ইয়াহিয়া সিনওয়ার ২০২৪ সালের অক্টোবরে গাজার রাফাহতে প্রাণ হারান। কোনো পরিকল্পিত বিমান হামলা নয়, বরং ইসরায়েলি স্থলবাহিনীর একটি রুটিন টহল দলের সঙ্গে আকস্মিক বন্দুকযুদ্ধে তিনি নিহত হন। শেষ মুহূর্তেও একটি লাঠি দিয়ে ইসরায়েলি ড্রোন প্রতিরোধের চেষ্টা করা সিনওয়ারের সেই ড্রোন ফুটেজ বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। স্নাইপারের গুলি ও ট্যাংকের গোলার আঘাতে তাঁর মৃত্যু হয় বলে পরে ফরেনসিক রিপোর্টে জানা যায়।

এই ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ডগুলো কেবল এক একজন ব্যক্তির মৃত্যু নয়, বরং প্রতিটি ঘটনা মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যে ফেলেছে গভীর প্রভাব।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.




© All rights reserved ©ekusheysylhet.com
Design BY DHAKA-HOST-BD
weeefff